asmani gojob banor hoye dhongsho hoyachilo boni israil jati

আসমানি গজবে বানর হয়ে ধ্বংস হয়েছিল বনি ইসরাইল জাতি

নানা সময় নানা পাপের কারণে আসমানী গজব দিয়ে আল্লাহ তাআলা সেই পাপীদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাদের নাম নিশানা মুছে দিয়েছেন চিরতরে। মানুষ তাদের নাম আজও স্মরণ করে তবে সেটা ঘৃনার সাথে। আর যত জাতি বা গোষ্ঠী আল্লাহর গজবে ধ্বংস হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম বনী ইসরাঈল। 

পাপের কারণে তাদের পরিণতি হয়েছিল একেবারেই করুন। কিভাবে তারা ধ্বংস হলো বা কোন পাপের কারণে তারা ধ্বংস হল এর বিস্তারিত ঘটনা জানাবো এই আর্টিকেলটিতে।  আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ পড়ার অনুরোধ রইল। 

বনি ইসরাইলের ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসার কারণ:

শুরু করছি মূল আলোচনা, পবিত্র  দিন নিয়ে মতো বিরোধের আলোচনা আল কুরআনেও এসেছে। হযরত ইব্রাহিম (আ.) মুসলিম জাতির পিতা। তার দুইজন ছেলে সন্তানও ছিলো। একজন হলেন হযরত ইসমাইল (আ.) আর অন্যজন ইসহাক (আ.)।  ইব্রাহিম আলাই সালাম এর পর তার রেখে যাওয়া দিনগুলোকে তার ছেলেরাই প্রচার করেন।  

ইসহাক (আ.) এর সন্তান ছিলেন হযরত ইয়াকুব (আ.)। তার আরেক নাম ছিলো ইজরাইল। তার সন্তানদিকে বলা হয় বনী ইসরাঈল। এছাড়া বনী ইসরাইলের স্বভাৱ ছিলো সবকাজে মতোবিরোধ করা। তাই এখনো কেউ যদি সব বিষয়ে মতবিরোধে জড়ায় তাকে বনী ইসরাঈল বলে গালি দেওয়া হয়। 

তাদের মতবিরোধ সাধারণ মানুষের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং নবীদের মধ্যেও তারা মতবিরোধে লিপ্ত হতো। একবার নবীদের মধ্যে মতবিরোধে জড়ায় পবিত্র দিনকে কেন্দ্র করে। সবার এই কথা জানা আছে যে, প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের জন্য সপ্তাহে একটি দিন নির্ধারিত থাকে। 

 যেমন মুসলমানদের পবিত্র দিন জুমার দিন, খ্রিষ্টানদের পবিত্র বার হচ্ছে  রবিবার। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর যুগ থেকে সব আসমানী ধর্মের অনুসারীরা পবিত্র দিন পালন করে আসছিল জুমার দিন।  মূসা (আ.) যুগে এসে বনি ইসরাঈল এ নিয়ে মূসা (আ.) এর সঙ্গে বিরোধে জড়ায়। 

তারা শুক্রবারের পরিবর্তে অন্যকোনো দিনকে পবিত্র দিন হিসেবে ঘোষণার দাবি করে। হযরত মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বোঝালেন যে , শুক্রবারকে আল্লাহতালা নিজেই ঠিক করে দিয়েছেন। তাই শুক্রবার সবার জন্য বরকতময় ও পবিত্র। শুক্রবার পরিবর্তন করা কোনোভাবেই ঠিক হবেনা।

বনি ইসরাইল ছিল এমন জাতি যারা কোন বিষয়ে দাবি জানানোর পর বাস্তবায়নের আগেই সেখান থেকে তারা ফিরে আসত না। তাই বহু বার বোঝানোর পরেও তারা নিজেদের দাবির ওপর অটল থাকে। তখন আল্লাহ তা’আলা শুক্রবারের পরিবর্তে শনিবারকে ইবাদতের দিন হিসেবে ঠিক করে দিলেন। 

ওহীর মাধ্যমে মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানিয়ে দিলেন। মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বিধান বলে দিলেন যে, ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ ও পশুপালন সহ যাবতীয় জাগতিক কার্যক্রম এই দিনে হারাম। এই দিনে শুধুমাত্র আল্লাহ তা’আলার এবাদতে রত থাকতে হবে। ঐদিনের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।

মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র দিনের মর্যাদা রক্ষার শপথ নিলেন। পবিত্র দিন নির্ধারণ নিয়ে মতবিরোধ এর আলোচনা আল কোরআনেও এসেছে। এই ভাবে নিশ্চয়ই শনিবারকে ওই লোকদের জন্য ইবাদতের দিন হিসেবে ধার্য করা হয়েছে যারা এই নিয়ে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েছিল। 

নিশ্চয়ই আপনার প্রভু কিয়ামত দিবসে তাদের মাঝে ওই বিষয়ের ফয়সালা দিবেন, যা নিয়ে তারা মতবিরোধী ছিলো। যা সূরা না-হোলের মধ্যে উল্লেখ রয়েছে। হযরত মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শপথ করানোর আলোচনায় এসেছে সূরা নিসার 135 নম্বর আয়াতে। 

সেখানে বলা হয়েছে , আর আমি বনী ইসরাইলদের বলেছি তোমরা শনিবারের ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘন করো না এবং আমি তাদের থেকে এ ব্যাপারে শক্তভাবে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছি কিন্তু বনী-ইসরাঈল নিজেরা যা চেয়ে এনেছিল তার মর্যাদা রক্ষার জন্য শপথ নিয়েছিল, তাদের নবী তা কী শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পেরেছিল? তাহলে চলুন আর একটু সামনের দিকে যাওয়া যাক। 

Related Gojol

মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার বহুদিন পরের ঘটনা। বনী-ইসরাঈলের একটা অংশ পাহাড়ে কুলসুমের তীরে বসতি স্থাপন করে। পাহাড়ে কুলসুম হলো বিখ্যাত বড় লোহিত সাগর। যেহেতু তাদের বসবাস ছিল সাগরতীরে, তাই মাছ শিকার করা কিছু মানুষের পেশা হয়ে গেল। শুধু পেশাই নই… অন্য যে কোন পেশার চেয়ে এটা ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয়। 

স্বাভাবিকভাবেই মাছ বিক্রি করার সঙ্গেও কিছু মানুষ যুক্ত হলো।  তাদের অবস্থা ছিল, তারা শনিবারে কোন কাজে যায় না. আল্লাহর ইবাদতের জন্য ফাঁকা রেখে বাকি ছয় দিন মাছ শিকার ও ক্রয়-বিক্রয়ে লিপ্ত থাকে। মাছের মাঝেও আল্লাহ তাআলা অনুভূতি দিয়ে রেখেছেন। মাছেরা যখন বুঝতে পারলো যে, ৬দিন আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তাই তারা সেই দিনগুলোতে সমুদ্রের তলদেশে চলে যায়, আর শনিবার হলো তাদের জন্য নিরাপদ তাই তারা শনিবারে পানির উপরে ভেসে সাঁতার কাটে।   

তখন আল্লাহ তাআলাও চাইলেন এর দ্বারা বনি ইসরাইলের ঈমানের উপর একটা পরীক্ষা নেয়া যাক। এক পর্যায়ে সপ্তাহের বাকী ছয়দিন মাছ শিকার করা মুশকিল হয়ে গেল।  এই কয়দিন সমুদ্রের অবস্থা দেখে মনে হত সমুদ্রে কোন মাছ  নেই কিন্তু শনিবার পানির উপরে ভেসে ওঠা মাছের পরিমাণ এত বেশি হতো যে জাল ছাড়া খালি হাতে মাছ ধরা যেত। এটা মূলত আল্লাহতালার পরীক্ষা।  

বনি ইসরাইল কিছুদিন সেই পরীক্ষায় ধৈর্যের পরিচয় দেয় কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা ব্যর্থ হয়।  কিছুদিন যাওয়ার পর তাদের মাঝে কিছু মানুষ মাছ শিকারের জন্য কৌশল অবলম্বন করল। কারো কারো কৌশল ছিল জুম্মার দিন সন্ধ্যায় সমুদ্রের তীরে গর্ত করে বানিয়ে রেখে দিতো। সমুদ্রের সঙ্গে সংযোগের জন্য একটি নালা খোদায় করতো।  শনিবার পানির উপরে মাছ ভেসে উঠলে তারা ওই নালার মুখ খুলে দিতো। নালা দিয়ে গর্তে পানি আসতো সঙ্গে মাছও চলে আসত এরপর গর্তের মুখ বন্ধ করে রেখে দিতো। 

রবিবার তারা সেই মাছ ধরে বিক্রি করতো। কেউ কেউ  অন্য কৌশলও  অবলম্বন করল। জুমার দিন রাতে জাল পেতে রেখে আসতো। শনিবারে তাতে মাছ  লেগে থাকত। রবিবারে তারা জাল থেকে মাছ ধরতো। বনী ইসরাইলের যারা এসবের সঙ্গে যুক্ত ছিল তারা খুবই আনন্দিত ছিল। 

কারণ বাহ্যিকভাবে দেখলে যে কেউ মনে করবে তারা তো ওই দিনের অমর্যাদা করছে না। আবার নিজেদের স্বার্থও  হাসিল হতো। তাই যখন আলেমরা তাদেরকে বোঝাতো, তখন তারা উত্তর দিত যে আমাদের দ্বারা শরীয়তের কোন হুকুম লঙ্গন হচ্ছে না কারণ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শনিবারে মাছ শিকার করতে নিষেধ করেছেন।  

আমরা শনিবারে মাছ শিকার করছি না।  জবানে তারা এই কথা বললেও মনের অবস্থা ছিল ভিন্ন। তারা বুজতো যে আমাদের দ্বারা সীমা লংঘন হচ্ছে কিন্তু আলেমদেরকে গোজামিল দিয়ে তারা বোঝানোর চেষ্টা করতো।  তাদের দেখে অন্য মানুষরাও মাছ শিকারের কৌশল অবলম্বন করে।  শেষ পর্যায়ে সবাই কৌশলের আড়ালে শনিবারের মর্যাদাকে নষ্ট করে।  

অন্যায় যে করে আর ক্ষমতা থাকার পরেও সেই অন্যায়কে যে বাধা প্রদান না করে তাহলে অন্যায়কারী ও অন্যায় সহ্যকারী উভয় সমান অপরাধী। বনী ইসরাইলের এই অন্যায় দেখে আল্লাহর কিছু নেকবান্দা তাদের বাঁধা দিলো। তারা মনে করতো এটা তাদের দায়িত্ব যে, কেউ খারাপ কাজ করলে তাদেরকে বাধা দেওয়া। কিন্তু বনী ইসরাইল তাদের কথায় কোনো পাত্তাই দিল না। 

বরং অন্যায় কাজ তারা আরো জোর দিয়ে করতে লাগল। বাধাদানকারীদের মধ্যে তখন দুই দল হয়ে গেল।  এক দলের বক্তব্য হলো তারা যেহেতু আমাদের কথা শুনছে না তাহলে তাদেরকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিই। আমাদের বলার কিছুই নেই।  

আরেক দলের বক্তব্য ছিল তাদেরকে বাধা দিয়ে আমরা আমাদের দায়িত্ব আদায় করে যেতে থাকবো, যেন কিয়ামত দিবসে আমরা আল্লাহর ওজর পেশ করতে পারি যে, হে আল্লাহ আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করেছি কিন্তু তারা বিরত হয়নি।  এছাড়া আমরা এখনো আশাবাদী যে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে হেদায়েত দান করবেন।  

বিভিন্ন মুফাসসির লিখেছেন যে, বাধাদানকারীদের এই দল কোনভাবেই যখন তাদেরকে ফেরাতে পারল না তখন তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল।  এমনকি নিজেদের ঘরের দরজা পর্যন্ত বন্ধ করে দিল।  আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে আযাব থেকে রেহাই দিয়েছিলেন। কারো কোন কথা না শুনে কৌশলে বনি ইসরাইল মাছ শিকার করতেই থাকলো।  কারো বাধা তারা মানল না।  

অবশেষে আল্লাহর কুদরতি ফয়ছালা চলে আসলো।  বনি ইসরাইল যেহেতু আল্লাহর হুকুম বিকৃত করেছিল তাই আল্লাহর আযাবের ফয়ছালা ছিল, তাদের চেহারা বিকৃত করে দেওয়া।  আল্লাহর ইশারায় বনী ইসরাইলের এই অংশটি বানর ও শূকরে রূপান্তরিত হয়ে গেল।  সৃষ্টির সেরা মানুষ থেকে এখন তারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রানীতে রূপান্তরিত হলো।  

বাধাদানকারীদের যারা আজাব থেকে রেহাই পেয়েছিলো, দীর্ঘ সময় চলে যাওয়ার পরেও মানুষের কোনো নড়াচড়া না পেয়ে সেই এলাকাগুলোতে প্রবেশ করলো।  তারা গিয়ে ওই অবস্থা দেখে বানর ও শূকরগুলোকে প্রশ্ন করে। আমরা কি খোদার হুকুম লংঘন করা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করিনি? 

তাদের চেহারা বিকৃত হয়ে গেলেও তাদের বুদ্ধি তখনও  অবশিষ্ট ছিল। তারা তাদের কাছে এসে মাথা নাড়িয়ে তাদের প্রশ্নের জবাব দেয়। এইভাবে তারা তিন দিন জীবিত ছিল।  এরপর তারা সবাই মারা যায়।  

প্রথমত এই ঘটনার মূল শিক্ষা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা যে বস্তুকে হারাম করেছেন কারো জন্য উচিত হবে না ওই বস্তুকে হালাল করে ফেলা।  দ্বিতীয়ত মানুষের মাঝে সংস্কার ও সংশোধনের কাজ করার ক্ষেত্রে কে শুনলো আর কে শুনলো  না সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করা।  বরং নিজের সার্ধ অনুযায়ী কর্তব্য পালন করা। 

আর সব শেষ এবং তৃতীয় শিক্ষা হচ্ছে বিপদাপদকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা করে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করা।  শরীয়তের সীমা লংঘন করে সাময়িকভাবে লাভবান হলেও চূড়ান্ত ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হয়।  বর্তমান সময়ে আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধৈর্য হারিয়ে ফেলি নিজের ইচ্ছা মিটানোর জন্য আল্লাহর বিধি-বিধান এর কোনো তোয়াক্কাই করিনা। 

পরিণতিতে নেমে আসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মহামারীর মতো বিপর্যয়।  নিজের ইচ্ছা মিটানোর জন্য আল্লাহর বিধি-বিধানের কোনো তোয়াক্কাই করিনা, যা মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।  তাই কর্তব্য হলো স্রষ্টার বিধানকে গুরুত্ব দেওয়া। পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করা।  

প্রিয় মুসাফিরবাসী জুলুম বা অন্যায় যখন চরমে পৌঁছে যায় ঠিক তখনই আসমান থেকে গজব নাযিল হয়।  বর্তমান পৃথিবীতে বিশ্বের অনেক দেশে মুসলিমদের উপর জুলুম এবং অত্যাচার চলছে।  আপনার কি মনে হয়…. এসব অত্যাচারী জালিমদের উপরে একদিন গজব নাজিল হবে না? ইনশাআল্লাহ  অবশ্যই তাদের বিচার হবে। 

Related Vedios

Related post: